আপডেটের সময়ঃ ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
শীত এলেই বাঙালির মনে পড়ে ভাপা পিঠার কথা। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাপা পিঠা আর খেজুরের গুড়ের মিষ্টি গন্ধ-এ যেন এক চিরায়ত উৎসবের প্রতিচ্ছবি। তবে এবার সেই চিরচেনা সাদা রঙের ভাপা পিঠাকে ছাপিয়ে পাহাড়ের বাজারে চলে এসেছে এক নতুন সংস্করণ-‘কালো রঙের ভাপা পিঠা’। এই পিঠা ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক দারুণ মেলবন্ধন তৈরি করেছে ভোজনরসিকদের মধ্যে।
সন্ধ্যা নামতেই জেলার শহরের আনাচে-কানাচে বসে হরেক রকমের পিঠার ভাসমান দোকান। এই দোকানগুলোতে তৈরি হচ্ছে পাহাড়ে জুমে উৎপাদিত কালো বিনি চালের কালো ভাপা পিঠা। এর ব্যতিক্রমী রঙ ও স্বাদের জন্য এটি স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে দারুণ সমাদৃত হচ্ছে। এই পিঠা দেখতে অনেকটা চকলেট কেকের মতো হলেও, এটি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। এছাড়াও এই পিঠার পাশাপাশি রয়েছে, চিতই, সাদা ভাপা,তেলেভাজা পিঠা। সাধারণ ভাপা পিঠার মতোই এটি তৈরি হয়, তবে চালের ভিন্নতার কারণে এর স্বাদ ও গন্ধে এক নতুনত্ব আসে। কালো বিনি চাল গুঁড়ো করে নারকেল ও গুড় দিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়। তবে পাহাড়ে শীতে স্থানীয় ও পর্যটকদের আকর্ষণ করছে এই ‘কালো রঙের ভাপা পিঠা।’
শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখা যায়, শহরের রাজবাড়ি স্টেডিয়াম এলাকা, বনরূপা এবং আসামবস্তি সহ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি পিঠার ভাসমান দোকান বসেছে। যাদের প্রায় সবাই কালো বিনি চালের পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত। সাদা চালের পিঠার চেয়ে এই পিঠার চাহিদাই বেশি দেখা যায়। বিকেল থেকে রাত অব্দি এসব দোকানে চলে পিঠা বিক্রি। কাঁঠাল পাতায় পরিবেশন করা এই পিঠা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই এর স্বাদও অতুলনীয়। এই বিশেষ পিঠাটি স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও মন জয় করে নিয়েছে।

বিকেলের পর থেকে পিঠাপ্রেমীদের ভিড় জমতে শুরু করে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। ছোট-থেকে বড়, পাহাড়ি-বাঙালি সকলের কাছেই সমান জনপ্রিয় এই কালো পিঠা। কাঁঠাল পাতায় করে পরিবেশন করা হয় এই পিঠা।
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক বাবুল করিম জানান, এই কালো রঙের ভাপা পিঠা তিনি প্রথম খেয়েছেন। খেতে খুবই সুস্বাদু। তিনি আরো জানান, কালো চালের নিজস্ব একটি সুগন্ধ আছে, যা সাধারণ ভাপা পিঠার চেয়ে এটিকে আলাদা করে তোলে।
পিঠা খেতে আসা স্থানীয় রূপময় চাকমা জানান, এই পিঠাটি বাংলাদেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। এটি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই পাওয়া যায়। সাদা পিঠার চেয়ে এই পিঠার স্বাদ বেশি। তিনি আরো জানান, এক সময় রাঙামাটির আসামবস্তি এলাকায় নারীরা জুমের বিনি চাল দিয়ে এই ধরনের পিঠা তৈরি করতেন, যা এখন আবার নতুন করে জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
আরেক স্থানীয় মিনতি চাকমা জানান, পাহাড়ে অনেক ধরনের পিঠাই হয়। যার মধ্যে কলাপাতা পিঠা, ছাইন্না পিঠা, বড়া পিঠা ইত্যাদি অন্যতম। তবে নতুন বিনি চালের এই পিঠাটা অন্যান্য পিঠার থেকে স্বাদে আলাদা। তাই এটার জনপ্রিয়তাও বেশি। আমি প্রায় প্রতিদিনই পরিবারের ছোটদের জন্য নিয়ে যাই।
পিঠা বিক্রেতা পরানি চাকমা জানান, এই পিঠার স্বাদ একটু আলাদা। সাদা পিঠা একটু শক্ত হলেও এটা নরম হয়। যেহেতু চালটার বিশেষত্ব আছে, তাই পিঠার স্বাদ এবং পুষ্টিগুণও ভালো। তিনি আরো জানান, এই পিঠা ব্যতিক্রমি হওয়ায় পর্যটক ও স্থানীয়রা বেশ পছন্দ করেন। প্রতি পিস পিঠা ২০ টাকা করে বিক্রি করছি।
পিঠা বিক্রেতা সুবর্ণা চাকমা জানান, পাহাড়ের জুমে উৎপাদিত বিশেষ বিনি চাল দিয়ে এই কালো ভাপা পিঠা তৈরি করা হয়। প্রথমে চাল সংগ্রহ করে এগুলো পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকাই। শুকানোর পর মেশিনে গুঁড়ো করা হয়। গুঁড়ো হওয়া চালগুলো হালকা পানি এবং লবণ দিয়ে মাখানোর পর ভাপে দেওয়া হয় এবং কিছুক্ষণ পর নামিয়ে কাঁঠাল পাতায় পরিবেশন করা হয়। তিনি আরো জানান, এই পিঠাগুলো কিছুটা আঁঠালো কিন্তু অন্যান্য চালের গুঁড়ার পিঠার চেয়ে এগুলোর স্বাদ বেশি।
আরেক বিক্রেতা নিয়তি চাকমা জানান, বিনি চাল অনেক প্রকারের হয়। সাদা বিনিও হয়, তবে এই কালো বিনি চালটার নাম লঙ্কা পড়া বিনি। এই চালের গুঁড়ার সঙ্গে নারিকেল, গুড় মিশিয়ে ভাপে দিয়ে পিঠাটা তৈরি করা হয়। এই পিঠার স্বাদ অন্যান্য পিঠা থেকে বেশি তাই সবার মধ্যে এটির চাহিদাও বেশি।
দিনদিন জনপ্রিয়তা বাড়ছে পাহাড়ি এই পিঠার। সুখ্যাতি লাভ করেছে রাঙামাটির বাইরেও। স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকরাও রাঙামাটি বেড়াতে এসে এই পিঠার স্বাদ নিতে ছুটে আসছেন। জুমের বিনি চালের কালো ভাপা পিঠা সারাদেশে পরিচিত পাবে এমনটাই প্রত্যাশা ক্রেতা-বিক্রতাদের।