রঙিন সুতোয় সুখের সংসার :পাহাড়ের নারীদের সংগ্রামের গল্প

পছন্দের তালিকায় থাকছে পিনন-হাদি

আপডেটের সময়ঃ ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক :

পাহাড়ের বুক চিরে সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় তাদের ব্যস্ততা। একদিকে ঘরের কাজ, অন্যদিকে কোমর তাঁতে রঙিন সুতোর বুনন। রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ের জুমচাষি নারীদের হাত ধরে আজ বদলে যাচ্ছে শত শত পরিবারের ভাগ্য। আদিম এই শিল্প এখন আর কেবল নিজেদের ঐতিহ্যবাহি পোশাক তৈরির মাধ্যম নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে পাহাড়ি নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রধান হাতিয়ার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা বংশপরম্পরায় ‘কোমর তাঁত’ বা ‘ব্যাকস্ট্র্যাপ লুম’ পদ্ধতিতে কাপড় বুনে আসছেন। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নারীরা পরম মমতায় তৈরি করছেন হাতে বোনা এই পোশাক।  আগে এই কাপড় শুধু নিজেদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হতো। কিন্তু আধুনিক কারুকাজ ও বাহারি রঙের সংমিশ্রণে এটি এখন সমতলের মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়। একজোড়া পিনন-হাদি নকশা ও মানভেদে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মাসে ৩-৪টি পোশাক বুনে একজন নারী অনায়াসেই ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন।
আরো জানা গেছে, বর্তমান বাজারে পিনন, হাদি এবং থামির ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পিনন-হাদি বিক্রি করে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছেন অনেক উপজাতি পরিবার। এছাড়াও পহেলা বৈশাখ, সাংগ্রাই, বিসু, বিহু, বৈসাবি আসলে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে তাদের ভালো মুনাফা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে পিনন, হাদি এবং থামির দোকান রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পর্যটকরা এই দোকানগুলো থেকে পিনন, হাদি এবং থামি কিনছে। এছাড়াও জেলা শহরের বনরূপা বাজারে ভোরের সূর্য উঠার আগে প্রতি শনিবার ও বুধবার পিনন, হাদি এবং থামির একটি হাট বসে। এই হাটে ভিড় জমায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা স্থানীয় নারীরা। তারা জানান, এই পিনন, হাদি এবং থামি পাহাড়ে স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়াও শীতের এই সময়ে পাহাড়ে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। রাঙ্গামাটির সাজেক ও স্থানীয় বাজারগুলোতে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় থাকছে এই হস্তশিল্প।

রাঙ্গামাটিসদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের বিক্রেতা পরানি চাকমা জানান, “আগে শুধু জুমের ফসলের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সারাদিনের কাজ শেষে সুতো নিয়ে বসি। একটি ওড়না বা থামি বুনে বাজারে বিক্রি করলে ভালো টাকা পাওয়া যায়। এই রঙিন সুতোতেই এখন আমাদের সংসারের সুখ জড়িয়ে আছে।”
রাঙ্গামাটি শহরের স্থানীয় বিক্রেতা চিচিকো চাকমা জানান, “আগে আমরা শুধু নিজেদের জন্য বানাতাম। এখন ফেসবুক আর পর্যটকদের মাধ্যমে অনেক অর্ডার পাই। এছাড়াও প্রতি শনিবার ও বুধবার শহরের বনরূপায় ভোরের সূর্য আকাশে ওঠার আগে পিনন,হাদি এবং থামি বিক্রি করি। এই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ চলে।”
তবে এই সাফল্যের পথ খুব একটা মসৃণ নয়। বাজারে সুতোর চড়া দাম, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থার সংকটে ভুগছেন অনেক নারী। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় তারা হাড়ভাঙা খাটুনির সঠিক মূল্য পান না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এই শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
নারী উদ্যোক্তা রিনা চাকমা জানান, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে জীবন যেখানে কঠিন, সেখানে সুতোর টানে স্বপ্ন বুনছেন এই নারীরা। তাদের এই সংগ্রাম কেবল টিকে থাকার নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে অর্থনৈতিক মুক্তির। পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন রঙিন সুতোর খটখট শব্দে নতুন দিনের গান বেজে ওঠে।
রাঙ্গামাটি জেলা বিসিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোঃ ইসমাইল হোসেন জানান,‘‘ তাদের প্রতিষ্ঠানে যারা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে,তাদেরকে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি যদি রাঙ্গামাটি জেলার বা দেশের সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এই শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।