রাঙামাটিতে বিজু–সাংগ্রাই,বৈসুক, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু উৎসবের উদ্বোধন

উৎসবমুখর পাহাড়

আপডেটের সময়ঃ এপ্রিল ৩০, ২০২৬

 

ডেস্ক রিপোর্ট:-

বর্ষবিদায় ও নববর্ষ বরণের উৎসব ঘিরে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি এখন আনন্দে মুখর। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৃহত্তম সামাজিক এ উৎসবকে কেন্দ্র করে শহর, নগর ও পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। পাহাড়ে এই উৎসব ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত হলেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কাছে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে উদযাপিত হয়—বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু। বাঙালির নববর্ষ এবং পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসব মিলেমিশে রাঙামাটিতে সৃষ্টি করেছে সম্প্রীতির এক অনন্য আবহ।

এ উপলক্ষে বুধবার রাঙামাটি পৌরসভা চত্বরে বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ‘জুম্ম জাতিয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ এবং অপসংস্কৃতির প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলুন’—এই প্রতিপাদ্যে অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু-২০২৬ উৎসবের শুভ সূচনা করেন। পরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তরুন-তরুণীরা মনোজ্ঞ উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করে অনুষ্ঠানে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়।
উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বৈসাবি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উষাতন তালুকদার বলেন, পুরাতন বছরের দুঃখ-গ্লানি ও ব্যর্থতা ভুলে নতুন বছরকে বরণ করার মধ্য দিয়ে মানুষ শান্তি, সমৃদ্ধি ও সহাবস্থানের স্বপ্ন দেখে। তিনি বলেন, “এই পৃথিবীকে শিশুদের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে হানাহানি, সহিংসতা ও বিদ্বেষ দূর করতে হবে। আমরা সবাই মানুষ—মানুষের মতো জীবন যাপন করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “বিজু মানে আমাদের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, খাবার-দাবারসহ অনেক ঐতিহ্য আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আমরা জুম্ম—আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও জাতিসত্তা যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।”

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উষাতন তালুকদার বলেন, অতীতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির ১৩ বার সংলাপ হলেও নানা কারণে চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলো সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।
তিনি বলেন, “অতীতের গ্লানি ভুলে আমরা নতুনভাবে এগিয়ে যেতে চাই। পার্বত্য অঞ্চলকে অবহেলিত না রেখে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। আমরাও বাংলাদেশের নাগরিক—মানুষের মতো বাঁচতে চাই, এর বেশি কিছু চাই না।”
পার্বত্য সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা, যা সদিচ্ছা থাকলে সমাধান সম্ভব। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এটা কি আলাদা দেশ নাকি মগের মুল্লুক? এখানে মানুষ ঠিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না—কোন দেশে বাস করছি আমরা?”
উষাতন তালুকদার আরও বলেন, “বিজুকে সুন্দরভাবে উদযাপন করতে হলে রাজনীতির সঠিক পরিবেশ প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক ও ভালো সরকার না থাকলে আমাদের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। আমরা ভূমি হারাচ্ছি, হারানোর পথে আছি। তাই রাজনৈতিক অধিকার ও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি আমাদের তুলতেই হবে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সঙ্গে বিজু উৎসব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পাশাপাশি তিনি দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বৈসাবি উৎসবের আগাম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

আলোচনা শেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ব্যানার ও জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের স্লোগান সম্বলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করেন। র‌্যালিটি রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জুম্ম জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জোর দাবি জানান তারা।